বেকার তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। ২০০৯ সালের পর থেকে সরকার একের পর এক প্রকল্প ও কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণদের কম্পিউটার দক্ষতা, অনলাইন আউটসোর্সিং, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক ডিজাইন, সাইবার নিরাপত্তা ও নতুন প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে।
কিন্তু নতুন প্রকল্প সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো প্রশ্নটিও ফিরে এসেছে—গত ১৭ বছরে একই ধরনের প্রশিক্ষণে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, কতজন প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এবং প্রশিক্ষণের পর বাস্তবে কতজন আয় করতে পেরেছেন?
২০০৯ থেকে শুরু: ফ্রিল্যান্সিং তখনও ছিল প্রাথমিক পর্যায়ে
বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে ফ্রিল্যান্সিং দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়ার সময় আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়ছিল।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা UNCTAD-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সালে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সাররা Upwork-এর তৎকালীন প্ল্যাটফর্মে থাকা মোট কাজের প্রায় ২ শতাংশ সম্পন্ন করতেন। ২০১২ সালে তা বেড়ে ১২ শতাংশে পৌঁছায়। একই সময়ে ICT মন্ত্রণালয় প্রায় ৯ হাজার মানুষকে অ্যানিমেশন, গ্রাফিকস, SEO ও ভিডিও এডিটিংসহ ফ্রিল্যান্সিং দক্ষতায় প্রশিক্ষণ দিয়েছিল।
২০১৩-১৪ সালের দিকে সরকার ফ্রিল্যান্সিংকে আরও বড় কর্মসংস্থান খাত হিসেবে দেখার উদ্যোগ নেয়। ২০১৩ সালে চালু হওয়া Leveraging ICT for Growth, Employment and Governance (LICT) প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল IT/ITES খাতে ৩৪ হাজার দক্ষ জনবল তৈরি করা। প্রকল্পটির ব্যয় ছিল প্রায় ৫৭২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, যার মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ছিল ৭০ কোটি মার্কিন ডলার।
এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতার সর্বশেষ সংযোজন হলো ৫১ হাজারের বেশি তরুণকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দিতে ৬৮৩ কোটি টাকার প্রস্তাবিত প্রকল্প। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তৈরি প্রকল্প প্রস্তাবটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রস্তাবিত মেয়াদ ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত।
বিশ্বব্যাংকের পরবর্তী মূল্যায়নে LICT-এর প্রশিক্ষণ থেকে বাস্তব কর্মসংস্থানের উদাহরণও পাওয়া যায়। একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ৩ হাজার ৫২৪ জনের মধ্যে ২ হাজার ৯০৯ জন, অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশ চাকরি পেয়েছিলেন বলে BSS জানিয়েছে।
Learning and Earning: বড় পরিসরে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ
এরপর আসে Learning and Earning Development Project—LEDP। ICT Division-এর এই প্রকল্প ২০১৪ সালে শুরু হয় এবং কয়েক ধাপে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে ২০২৩ সালে শেষ হয়।
সরকারি প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, LEDP-এর মাধ্যমে মোট ৫৩ হাজার তরুণকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে কোভিড-১৯ সময় প্রায় ৪০ হাজার প্রশিক্ষণার্থী অনলাইন বা ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।
তবে প্রকল্পের ফলাফল নিয়ে একেবারে একমুখী ছবি পাওয়া যায় না।
LEDP-এর সরকারি প্রভাব মূল্যায়নে প্রশিক্ষণের প্রায় দুই বছর পরের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রশিক্ষণার্থী চাকরিতে গেছেন এবং প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছেন। একই মূল্যায়নে প্রশিক্ষণের মান, প্রশিক্ষণ-পরবর্তী সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।
আরেকটি সরকারি মূল্যায়নে ৬০০ প্রশিক্ষণার্থীর নমুনা জরিপে দেখা যায়, প্রশিক্ষণের প্রায় দুই বছর পর ৪০ দশমিক ৩ শতাংশ বেকার ছিলেন। নারীদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার ছিল আরও বেশি—৫৪ দশমিক ২ শতাংশ। একই সঙ্গে প্রায় ২০ দশমিক ২ শতাংশ ফ্রিল্যান্সিংয়ে ছিলেন।
অর্থাৎ প্রশিক্ষণ কিছু মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করলেও প্রশিক্ষণ নেওয়া এবং টেকসই ফ্রিল্যান্সার হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়।
LICT, LEDP-এর পাশাপাশি SEIP
২০১৪ সালে সরকার Skills for Employment Investment Program—SEIP-ও চালু করে। এটি শুধু ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্প ছিল না; তৈরি পোশাক, নির্মাণ, স্বাস্থ্য, আইটি, ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন খাতে দক্ষতা উন্নয়নের বৃহৎ কর্মসূচি ছিল।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, SEIP-এর জন্য তিনটি ট্রাঞ্চে মোট ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত ADB অর্থায়ন নির্ধারিত হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল বাজারের চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে দক্ষতা তৈরি করা এবং বেসরকারি খাতকে প্রশিক্ষণে যুক্ত করা।
SEIP-এর অধীনে IT Freelancing—Digital Marketing & Admin Support নামে তিন মাসের কোর্সও চালু ছিল।
তাই ২০০৯-পরবর্তী সরকারি দক্ষতা উন্নয়ন ব্যয়ের হিসাব করতে গেলে শুধু ICT Division-এর ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্প নয়, SEIP-এর মতো বৃহত্তর দক্ষতা কর্মসূচিকেও আলাদা শ্রেণিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নারীদের জন্য She Power ও Her Power
ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের আরেকটি বড় ধারা ছিল নারীদের কেন্দ্র করে।
She Power Project-এর প্রথম পর্যায়ে ২১ জেলায় প্রায় ১০ হাজার ৫০০ নারীকে প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল freelancer-to-entrepreneur, IT service provider ও women call centre agent।
পরবর্তী সময়ে এটি বড় আকারে Her Power Project হিসেবে সম্প্রসারিত হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পে ২৫ হাজার ১২৫ নারীকে ICT পেশাজীবী ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়। গ্রাফিক ডিজাইন ও ওয়েব ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন ট্র্যাকে নারীদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
২০২২ সালের প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, এ পর্যায়ে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা বলা হয় এবং প্রশিক্ষণার্থীদের ল্যাপটপ দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল।
৪৭ কোটি থেকে ৩০০ কোটি: যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নতুন অধ্যায়
ICT Division-এর বাইরে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণে বড় আকারে যুক্ত হয়।
২০২২ সালে ১৬ জেলার পরীক্ষামূলক প্রকল্পে ৬ হাজার ৪০০ তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ৪৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৯০০ জন প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং তাঁদের ৬৪ শতাংশ আয়মূলক কাজে যুক্ত হয়েছেন বলে পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন।
এরপর ৪৮ জেলায় ২৮ হাজার ৮০০ তরুণকে প্রশিক্ষণ দিতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়। BPPA-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পে ১ হাজার ১৫২ ব্যাচে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল এবং প্রতিটি প্রশিক্ষণ ৬০০ ঘণ্টার। প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য ছিল প্রায় ২৯৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
এখানেও সরকারি তথ্যে প্রশিক্ষণার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আয় করছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, ফলে দীর্ঘমেয়াদি আয়কারীদের একটি একক যাচাইযোগ্য ডাটাবেসের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট।
EDGE: প্রশিক্ষণ থেকে সরাসরি চাকরির দিকে
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত Enhancing Digital Government and Economy—EDGE প্রকল্প।
২০২০ সালে অনুমোদিত EDGE প্রকল্পের মোট ব্যয় ছিল প্রায় ৩০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে IT workforce development একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ডিজিটাল ও disruptive technology-তে বড়সংখ্যক তরুণকে প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থান তৈরি করা।
এর Hire and Train কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল প্রশিক্ষণকে সরাসরি চাকরির সঙ্গে যুক্ত করা। EDGE-এর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ৫ হাজার ৩০০ জন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ চাকরি পেয়েছেন বলে প্রকল্পটি জানিয়েছে।
আরও সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদনে Hire and Train-এর ৫ হাজার ৫১৯ গ্র্যাজুয়েটের সরাসরি চাকরি পাওয়ার হার ৮১ দশমিক ৯ শতাংশ বলা হয়েছে।
এটি আগের প্রশিক্ষণ প্রকল্পগুলোর তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য—এখানে শুধু প্রশিক্ষণার্থী সংখ্যা নয়, চাকরিতে প্রবেশের ফলাফল মাপার চেষ্টা করা হচ্ছে।
২০২৬: আবার ৬৮৩ কোটি টাকার প্রশ্ন
এখন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পে ১৩ মহানগরের ৫১ হাজারের বেশি তরুণকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮৩ কোটি টাকা। প্রকল্পটি এখনো অনুমোদিত নয়; পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
অর্থাৎ এটি এখনই “সরকার ৬৮৩ কোটি টাকা খরচ করছে”—এভাবে লেখা ঠিক হবে না।
বরং বলা উচিত, “৬৮৩ কোটি টাকার প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে।”
১৭ বছরে আসল হিসাব কত?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি রয়েছে।
প্রথম আলোর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ICT Division-এর আওতায় ফ্রিল্যান্সিং, ভাষা, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সাক্ষরতা-সংক্রান্ত ১১টি প্রকল্প এবং ১৫টি কর্মসূচিতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের একটি গবেষণাভিত্তিক শ্বেতপত্র নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯-২০২৪ সময়ে ICT Division ও অধীনস্থ সংস্থাগুলো ২১টির বেশি প্রশিক্ষণ-কেন্দ্রিক প্রকল্প নিয়েছিল; ২০২২ সাল নাগাদ প্রশিক্ষণ উপাদান থাকা ১৯টি প্রকল্পের সম্মিলিত ব্যয় ছিল প্রায় ৯ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা।
দুটি সংখ্যাকে একসঙ্গে যোগ করা যাবে না। কারণ প্রকল্পের সংজ্ঞা, অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ উপাদানের পরিধি এবং সময়সীমা আলাদা। তবে দুটিই একটি বিষয় পরিষ্কার করে—গত দেড় দশকে সরকারি অর্থে ডিজিটাল দক্ষতা তৈরিতে বড় বিনিয়োগ হয়েছে।
তাহলে এত প্রকল্পের পরও প্রশ্ন কেন?
কারণ প্রশিক্ষণের সংখ্যা এবং বাস্তব কর্মসংস্থান এক নয়।
প্রথম আলোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০০৯-২০২৪ সময়ে ICT Division ৫৩টি প্রকল্প ও ৩৪টি কর্মসূচিতে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। একই প্রতিবেদনে ডিজিটাল সেবা, দক্ষতা ও ICT রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সব প্রকল্প ব্যর্থ। LICT-এর Hire and Train ধরনের উদ্যোগ এবং EDGE-এর চাকরিমুখী প্রশিক্ষণ থেকে শক্তিশালী ফল পাওয়া গেছে। একইভাবে LEDP ও যুব উন্নয়ন প্রকল্প থেকেও অনেক প্রশিক্ষণার্থী আয় শুরু করেছেন।
সমস্যা হলো সাফল্য পরিমাপের পদ্ধতি।
একটি প্রশিক্ষণ প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য হওয়া উচিত—প্রশিক্ষণের ছয় মাস, এক বছর ও দুই বছর পর কতজন নিয়মিত আয় করছেন; তাঁদের গড় আয় কত; কত বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে; কতজন চাকরি তৈরি করছেন এবং প্রশিক্ষণের প্রতি আয়কারী ব্যক্তির পেছনে সরকারের কত টাকা ব্যয় হয়েছে।
নতুন ৬৮৩ কোটি টাকার প্রকল্পে কী বদলানো দরকার?
আগের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নতুন প্রকল্পে শুধু প্রশিক্ষণার্থী সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট হবে না।
প্রথমত, প্রতিটি প্রশিক্ষণার্থীর জন্য unique digital ID এবং মার্কেটপ্লেসভিত্তিক আয় ট্র্যাকিং থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষণ শেষ করার পর অন্তত দুই বছর পর্যন্ত আয় ও কর্মসংস্থান অনুসরণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, AI-এর কারণে সাধারণ গ্রাফিক ডিজাইন, ডেটা এন্ট্রি বা কম-মূল্যের কাজের বাজার বদলে যাওয়ায় প্রশিক্ষণকে AI-assisted development, cybersecurity, software development, data analytics, automation ও high-value digital services-এর দিকে নিতে হবে।
চতুর্থত, EDGE-এর মতো training-to-job মডেল বাড়ানো দরকার।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—একই ধরনের প্রকল্প নেওয়ার আগে আগের প্রকল্পের স্বাধীন মূল্যায়ন প্রকাশ করা উচিত।
সময়কাল
- ২০০৯–২০১২: সরকারি পর্যায়ে ফ্রিল্যান্সিং ও ICT দক্ষতা প্রশিক্ষণের প্রাথমিক উদ্যোগ; প্রায় ৯ হাজার মানুষকে বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং দক্ষতায় প্রশিক্ষণের তথ্য পাওয়া যায়।
- ২০১৩: LICT প্রকল্প শুরু; IT/ITES খাতে ৩৪ হাজার দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্য।
- ২০১৪: Learning and Earning Development Project (LEDP) শুরু।
- ২০১৪: SEIP চালু; বিভিন্ন খাতের পাশাপাশি IT freelancing প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত।
- ২০১৭–২০১৯: She Power প্রকল্পের ২১ জেলায় নারীকেন্দ্রিক ICT ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ।
- ২০২০: EDGE প্রকল্প অনুমোদন; ডিজিটাল কর্মসংস্থান ও IT workforce development অন্তর্ভুক্ত।
- ২০২২: ১৬ জেলায় ৬,৪০০ তরুণের জন্য ৪৭.৫ কোটি টাকার যুব উন্নয়ন ফ্রিল্যান্সিং পাইলট প্রকল্প।
- ২০২২: Her Power-এর দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার নারী ICT প্রশিক্ষণ উদ্যোগ।
- ২০২৩: EDGE-এর Hire and Train কর্মসূচি শুরু; ২০ হাজার IT graduate প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য।
- ২০২৪: ৪৮ জেলায় ২৮,৮০০ তরুণের জন্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্প।
- ২০২৫–২০২৬: AI ও advanced technology-ভিত্তিক নতুন দক্ষতা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাড়ে।
- ২০২৬: ১৩ মহানগরে ৫১ হাজারের বেশি তরুণের জন্য ৬৮৩ কোটি টাকার নতুন ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্প প্রস্তাব।
Background
বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং খাতের বিকাশ মূলত ২০০৯-পরবর্তী সময়ে দ্রুত হয়। অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকার এটিকে বেকারত্ব কমানো ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে শুরু করে।
পরবর্তী সময়ে সরকারি উদ্যোগগুলো তিনটি বড় ধারায় ভাগ হয়ে যায়—ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ, IT/ITES চাকরির জন্য দক্ষতা উন্নয়ন এবং নারীদের ICT উদ্যোক্তা তৈরি।
LICT, LEDP, SEIP, She Power, Her Power, EDGE এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক প্রকল্পগুলো এই দীর্ঘ ধারার অংশ।
Impact Analysis
ইতিবাচক দিক
সরকারি প্রশিক্ষণ থেকে অনেক তরুণ বাস্তবে চাকরি বা ফ্রিল্যান্সিংয়ে প্রবেশ করেছেন। LICT-এর একটি Hire and Train কর্মসূচিতে প্রায় ৮০ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থী চাকরি পেয়েছিলেন। EDGE-এর সাম্প্রতিক তথ্যেও প্রায় ৮১.৯ শতাংশ direct job placement-এর কথা বলা হয়েছে।
নারীদের ক্ষেত্রেও She Power ও Her Power ICT-ভিত্তিক আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করেছে।
সীমাবদ্ধতা
LEDP-এর প্রভাব মূল্যায়ন দেখিয়েছে, প্রশিক্ষণের দুই বছর পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রশিক্ষণার্থী বেকার ছিলেন।
এ ছাড়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে পুনরাবৃত্তি, প্রশিক্ষণ-পরবর্তী সহায়তার অভাব এবং প্রকৃত আয় যাচাইয়ের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায়ও প্রশিক্ষণ প্রকল্পের কার্যকারিতা ও ব্যয়-সুবিধা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বর্তমান অবস্থা
২০০৯ থেকে ২০২৬—প্রায় ১৭ বছরে বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং ও ICT দক্ষতা উন্নয়নে একাধিক সরকারি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রকল্প থেকে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, আবার কিছু প্রকল্পের ফলাফল নিয়ে সরকারি মূল্যায়ন ও স্বাধীন গবেষণায় প্রশ্ন উঠেছে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় নতুন প্রস্তাব হলো ৬৮৩ কোটি টাকার, ৫১ হাজারের বেশি তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রকল্প। এটি এখনো অনুমোদিত নয়।
তাই নতুন প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু ৫১ হাজার মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে কি না—তার ওপর নয়। বরং প্রশিক্ষণের দুই বছর পর কতজন নিয়মিত আয় করছেন, কত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন এবং প্রতি সফল ফ্রিল্যান্সারের পেছনে রাষ্ট্রের প্রকৃত ব্যয় কত—এই তথ্য প্রকাশ করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, বাংলাদেশের এখন আর শুধু “ফ্রিল্যান্সার প্রশিক্ষণ” দরকার নেই; দরকার আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের কাজ করার মতো দক্ষতা, প্রশিক্ষণ-পরবর্তী মেন্টরিং এবং সরাসরি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা।
তথ্যসূত্র
- The Business Standard — ৬৮৩ কোটি টাকার নতুন ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্প
- প্রথম আলো — ২০০৯ থেকে ICT প্রশিক্ষণ প্রকল্পের ব্যয় ও বিশ্লেষণ
- প্রথম আলো — Digitalisation ও ICT প্রকল্পের সামগ্রিক বিশ্লেষণ
- World Bank — LICT Project
- Bangladesh Computer Council — LICT Project Brief
- ICT Division — Learning & Earning Development Project
- LEDP Impact Assessment — সরকারি প্রভাব মূল্যায়ন রিপোর্ট
- Asian Development Bank — Skills for Employment Investment Program
- PKSF — SEIP IT Freelancing Course
- The Daily Star — ১৬ জেলার ৪৭.৫ কোটি টাকার ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্প
- BPPA — ৪৮ জেলার ২৮,৮০০ তরুণের প্রকল্প ও চুক্তিমূল্য
- BSS — EDGE Hire and Train Programme
- World Bank — EDGE Project
- World Bank — EDGE Implementation Status & Results
- Her Power Project — সরকারি প্রশিক্ষণ কাঠামো
- UNCTAD — Bangladesh Services Policy Review
