কীভাবে চলে এই ছোট্ট ট্রেন?
সাধারণ একটি ব্যাটারি, ব্যাটারির দুই পাশে লাগানো শক্তিশালী নিওডিমিয়াম ম্যাগনেট এবং একটি দীর্ঘ কপার-কয়েল—এই তিনটি প্রধান উপাদান দিয়েই তৈরি করা যায় পরীক্ষামূলক ‘ইলেকট্রিক ট্রেন’। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ANU)-এর বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা মূলত হোমোপোলার মোটর-এর একটি সরল রূপ।
ব্যাটারির দুই প্রান্তে থাকা চুম্বক যখন কপার কয়েলের সঙ্গে বৈদ্যুতিক সংযোগ তৈরি করে, তখন একটি বন্ধ সার্কিট তৈরি হয়। ফলে ব্যাটারি থেকে বৈদ্যুতিক প্রবাহ কপার কয়েলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে।
এই বিদ্যুৎপ্রবাহের কারণে কপার তারের চারপাশে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়। সেই চৌম্বক ক্ষেত্র আবার ব্যাটারির দুই পাশে থাকা স্থায়ী চুম্বকের চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে।
এর ফলেই তৈরি হয় এমন একটি বল, যা ব্যাটারি ও চুম্বককে কয়েলের ভেতর দিয়ে সামনে ঠেলে দেয়।
আসল রহস্য ‘লরেঞ্জ বল’
এই পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদার্থবিজ্ঞানের ধারণা হলো Lorentz force বা লরেঞ্জ বল।
কোনো বৈদ্যুতিক প্রবাহমান পরিবাহী যখন একটি চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে থাকে, তখন তার ওপর একটি বল কাজ করতে পারে। এই বলের দিক নির্ভর করে বিদ্যুৎপ্রবাহ ও চৌম্বক ক্ষেত্রের দিকের ওপর।
হোমোপোলার মোটরের ক্ষেত্রেও একই নীতি কাজ করে। কপার তারে প্রবাহিত কারেন্ট এবং স্থায়ী চুম্বকের চৌম্বক ক্ষেত্রের পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে যান্ত্রিক বল তৈরি হয়।
অর্থাৎ এখানে কোনো ইঞ্জিন, গিয়ার, চাকা বা প্রচলিত মোটর নেই। বিদ্যুৎ → চৌম্বক ক্ষেত্র → বল → গতি—এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াতেই পুরো ঘটনাটি ঘটে।
সামনে টানে, পেছন থেকে ঠেলে দেয়
এই ‘ট্রেন’-এর বিশেষত্ব হলো ব্যাটারির দুই পাশে থাকা চুম্বক একই সঙ্গে ভূমিকা পালন করে।
ANU-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সঠিকভাবে চুম্বকের মেরু বিন্যাস করলে সামনের চুম্বকের ওপর আকর্ষণ এবং পেছনের চুম্বকের ওপর বিকর্ষণ—দুই ধরনের প্রভাব একসঙ্গে তৈরি হতে পারে। ফলে একটি push-pull effect তৈরি হয়, যা ব্যাটারি-চুম্বকের সমাবেশকে কপার কয়েলের মধ্য দিয়ে এগিয়ে নেয়।
এ কারণেই বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় ব্যাটারিটি যেন নিজে থেকেই কপার টানেলের ভেতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে।
এটি কি সত্যিকারের ‘ট্রেন’?
প্রযুক্তিগতভাবে এটি রেলওয়ের ট্রেন নয়। বরং এটি একটি শিক্ষামূলক ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক মোটর ডেমোনস্ট্রেশন।
পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এর কার্যপ্রণালি হোমোপোলার মোটরের সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পদার্থবিজ্ঞান ডেমোনস্ট্রেশন রিসোর্সেও ব্যাটারি, নিওডিমিয়াম ম্যাগনেট ও কপার তার ব্যবহার করে হোমোপোলার মোটরের একই মূল নীতি দেখানো হয়েছে।
এ ধরনের সরল মোটরের ঐতিহাসিক ভিত্তিও অনেক পুরোনো। ANU-এর তথ্য অনুযায়ী, মাইকেল ফ্যারাডে ১৮২১ সালে হোমোপোলার মোটরের প্রথম দিকের প্রদর্শন করেন।
কেন নিওডিমিয়াম ম্যাগনেট ব্যবহার করা হয়?
এই পরীক্ষায় সাধারণ চুম্বকের পরিবর্তে সাধারণত neodymium magnet ব্যবহার করা হয়। কারণ এগুলো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী স্থায়ী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র থাকলে বিদ্যুৎপ্রবাহের সঙ্গে চৌম্বক ক্ষেত্রের মিথস্ক্রিয়ায় কার্যকর বল তৈরি করা সহজ হয়।
তবে শক্তিশালী নিওডিমিয়াম ম্যাগনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। এগুলো ধাতব বস্তুকে জোরে আকর্ষণ করতে পারে এবং ভুলভাবে ব্যবহার করলে আঘাত বা অন্যান্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
কপার কয়েলের ভূমিকা কী?
কপার তার এখানে শুধু ‘রেল’ হিসেবে কাজ করে না। এটি একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক পরিবাহী এবং ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যখন কারেন্ট কপার তারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন তার চারপাশে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়। কয়েলের বহু পাকের কারণে স্থানীয়ভাবে তৈরি চৌম্বক ক্ষেত্রগুলোর সম্মিলিত প্রভাব পাওয়া যায়।
তবে এই পরীক্ষাটিকে প্রচলিত রেলগান বা ম্যাগলেভ ট্রেনের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। এটি অনেক বেশি সরল একটি বৈদ্যুতিক-চৌম্বকীয় প্রদর্শনী।
ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে ট্রেনও থেমে যায়
এই ব্যবস্থা কোনো ‘ফ্রি এনার্জি’ তৈরি করে না।
ট্রেনটি চলার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি আসে ব্যাটারির রাসায়নিক শক্তি থেকে। ব্যাটারি বৈদ্যুতিক শক্তি সরবরাহ করে, সেই শক্তি চৌম্বকীয় মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে যান্ত্রিক গতিতে রূপান্তরিত হয়।
ফলে ব্যাটারির শক্তি শেষ হয়ে গেলে ট্রেনের চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়।
গবেষণামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ধরনের ব্যাটারি-ম্যাগনেট-কয়েল ব্যবস্থার গতিকে চৌম্বক ক্ষেত্রের মিথস্ক্রিয়ার পাশাপাশি eddy-current-এর মতো বৈদ্যুতিক প্রভাব দিয়েও বিশ্লেষণ করা যায়।
গতি কেন সবসময় একই থাকে না?
ট্রেনটি শুরুতে দ্রুত চলতে দেখা গেলেও এর গতি সবসময় একই থাকে না। কয়েলের বৈশিষ্ট্য, ব্যাটারির ভোল্টেজ, চুম্বকের শক্তি, সংযোগের মান এবং ঘর্ষণসহ বিভিন্ন বিষয় গতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
গবেষণায় এই ধরনের সিস্টেমের terminal velocity বা সর্বোচ্চ স্থিতিশীল গতির বিষয়টিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং সেখানে eddy current-এর প্রভাব বিবেচনা করা হয়েছে।
অর্থাৎ ভিডিওতে কয়েক সেকেন্ডের একটি ছোট্ট পরীক্ষাকে দেখে এর গতি বা কার্যক্ষমতা সম্পর্কে বড় কোনো প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
এই ছোট্ট পরীক্ষার গুরুত্ব কোথায়?
দেখতে খেলনার মতো হলেও পরীক্ষাটি শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত কার্যকর।
একটি ছোট সেটআপের মাধ্যমে একই সঙ্গে বোঝানো যায়—
- বিদ্যুৎপ্রবাহ কীভাবে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে;
- স্থায়ী চুম্বক ও কারেন্টের মধ্যে কীভাবে বল সৃষ্টি হয়;
- লরেঞ্জ বল কী;
- হোমোপোলার মোটর কীভাবে কাজ করে;
- বৈদ্যুতিক শক্তি কীভাবে যান্ত্রিক গতিতে রূপান্তরিত হয়;
- বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্বের মধ্যে সম্পর্ক কী।
এই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় ও বিজ্ঞানশিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের পরীক্ষাকে পদার্থবিজ্ঞানের প্রদর্শনী হিসেবে ব্যবহার করে।
এটি কি ভবিষ্যতের ট্রেন প্রযুক্তি?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
এই ছোট্ট পরীক্ষাটি দেখে এটিকে সরাসরি ভবিষ্যতের উচ্চগতির রেল বা Maglev train প্রযুক্তির প্রোটোটাইপ বলা ঠিক হবে না।
বাস্তব ম্যাগলেভ ট্রেনে ট্রেনকে ভাসিয়ে রাখা, সামনে এগিয়ে নেওয়া এবং নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অনেক বেশি জটিল ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ব্যবস্থা, অবকাঠামো, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও শক্তি সরবরাহ প্রয়োজন।
এই ছোট্ট পরীক্ষার মূল মূল্য হলো—এটি মানুষের চোখের সামনে অত্যন্ত সহজভাবে দেখিয়ে দেয় যে বিদ্যুৎ ও চৌম্বকত্ব একে অপরের সঙ্গে কীভাবে কাজ করে এবং সেই মিথস্ক্রিয়া থেকে গতি তৈরি হতে পারে।
নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কতা
এ ধরনের পরীক্ষা শিশুদের একা করা উচিত নয়। বিশেষ করে শক্তিশালী নিওডিমিয়াম ম্যাগনেট ব্যবহার করলে সতর্কতা প্রয়োজন।
এ ছাড়া ব্যাটারির দুই প্রান্তকে পরিবাহী তার দিয়ে দীর্ঘ সময় সরাসরি সংযুক্ত রাখলে উচ্চ কারেন্ট প্রবাহিত হয়ে ব্যাটারি ও তার গরম হতে পারে। হোমোপোলার মোটর সম্পর্কিত শিক্ষামূলক উপকরণেও ব্যাটারি ও তার অতিরিক্ত গরম হওয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
তাই পরীক্ষাটি করলে প্রাপ্তবয়স্কের তত্ত্বাবধান, উপযুক্ত ব্যাটারি ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
শেষ কথা
একটি ব্যাটারি, দুটি ছোট চুম্বক এবং একটি কপার কয়েল—এই সামান্য উপকরণই বিদ্যুৎ ও চৌম্বকত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় চোখের সামনে তুলে ধরতে পারে।
‘ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ট্রেন’ আসলে কোনো জাদু নয়। এর পেছনে রয়েছে বৈদ্যুতিক প্রবাহ, চৌম্বক ক্ষেত্র এবং লরেঞ্জ বলের মৌলিক পদার্থবিজ্ঞান।
আর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো—পদার্থবিজ্ঞানের জটিল ধারণাগুলো বোঝাতে কখনো কখনো বড় ল্যাবরেটরি নয়, একটি ছোট ব্যাটারি ও কয়েকটি চুম্বকই যথেষ্ট।
Sources
- Australian National University — How to make your own electric train
- University of Iowa — Faraday Train
- BCIT — Homopolar Motor
- National Science Week — DIY Science: Homopolar Electric Motor
- Caltech LIGO — Homopolar Motor Educational Resource
- Museum of Science — DIY Simple Motor Using Battery, Magnets and Copper Wire
- Research Paper — Motions of a Homopolar Motor Inside a Conducting Tube
