নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে বড় ধরনের প্রকৌশলগত অগ্রগতি করেছে চীন। দেশটির বিজ্ঞানীরা ৫৮২ টন ওজনের একটি সুপারকন্ডাক্টিং টোরয়ডাল-ফিল্ড ম্যাগনেট তৈরি ও পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন, যা এখন পর্যন্ত ফিউশন রিঅ্যাক্টরের জন্য তৈরি সবচেয়ে বড় সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। ম্যাগনেটটির দৈর্ঘ্য ২১ মিটার, প্রস্থ ১২ মিটার এবং উচ্চতা ৩ দশমিক ৩ মিটার।
চীনের হেফেইয়ে অবস্থিত Institute of Plasma Physics, Chinese Academy of Sciences (ASIPP)-এর বিজ্ঞানীরা ২৭ জুন এই ম্যাগনেটের প্রযুক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা এবং পূর্ণ কর্মক্ষমতা পরীক্ষা শেষ করেন। একই সময়ে উচ্চ-তাপমাত্রার সুপারকন্ডাক্টিং সেন্ট্রাল সোলেনয়েডও পূর্ণ কর্মপরিসরে পরীক্ষা করা হয়।
এই অগ্রগতি চীনের CRAFT (Comprehensive Research Facility for Fusion Technology) এবং পরবর্তী প্রজন্মের BEST (Burning Plasma Experimental Superconducting Tokamak) ফিউশন কর্মসূচির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে।
কী এই ‘কৃত্রিম সূর্য’
নিউক্লিয়ার ফিউশন হলো সেই প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্রে বিপুল শক্তি উৎপন্ন হয়। পৃথিবীতে বিজ্ঞানীরা একই ধরনের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ঘটানোর চেষ্টা করছেন।
ফিউশনে হালকা পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় এনে একীভূত করা হয়। এতে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হতে পারে। কিন্তু ফিউশনের জন্য প্রয়োজনীয় প্লাজমার তাপমাত্রা এত বেশি যে কোনো প্রচলিত উপাদান সরাসরি সেটিকে ধারণ করতে পারে না।
এ কারণেই বিজ্ঞানীরা শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে প্লাজমাকে রিঅ্যাক্টরের দেয়াল থেকে দূরে রাখেন। চীনের নতুন ৫৮২ টনের ম্যাগনেটের মূল কাজও এ ধরনের চৌম্বকীয় আবদ্ধতা বা magnetic confinement তৈরি করা।
৫৮২ টনের ম্যাগনেটটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
চীনের তৈরি টোরয়ডাল-ফিল্ড ম্যাগনেটটি D-আকৃতির। এর ওজন ৫৮২ টন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ASIPP-এর তথ্য অনুযায়ী, এটি আন্তর্জাতিকভাবে ফিউশন রিঅ্যাক্টরের জন্য তৈরি সবচেয়ে বড় সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট।
এর আয়তন ITER-এর সমতুল্য টোরয়ডাল-ফিল্ড ম্যাগনেটের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৩ গুণ এবং শক্তি সঞ্চয়ের ক্ষমতা প্রায় তিন গুণ বলে চীনা গবেষণা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে। ম্যাগনেটটি প্রায় ৯৮ কিলোঅ্যাম্পিয়ার কারেন্টে কাজ করতে পারে এবং এর মোট শক্তি সঞ্চয়ক্ষমতা ১২০ গিগাজুল বলে ASIPP জানিয়েছে।
এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শুধু ম্যাগনেট তৈরি করলেই ফিউশন বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয় না। এটি বড় একটি প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাত্র।
পুরো প্রযুক্তিই দেশীয়ভাবে তৈরি
চীনের বিজ্ঞানীদের দাবি, নতুন ম্যাগনেটের মূল প্রযুক্তি ও উৎপাদনব্যবস্থার পুরো শৃঙ্খল দেশীয়ভাবে তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সুপারকন্ডাক্টিং উপাদান, কাঠামোগত নকশা, উৎপাদন সরঞ্জাম এবং নির্মাণপ্রক্রিয়া।
ASIPP জানিয়েছে, প্রায় ছয় বছরের গবেষণা ও উন্নয়নকাজের মাধ্যমে প্রকল্পটি সম্পন্ন হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে গবেষকরা ম্যাগনেট নকশা, কন্ডাক্টর উৎপাদন এবং quench protection-সহ একাধিক প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান করেছেন।
চীনা গবেষকদের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, একই ধরনের সুপারকন্ডাক্টিং উপাদানের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একসময় প্রতি মিটারে প্রায় ৪০০ ইউয়ান খরচ হলেও বর্তমানে তা প্রায় ১০০ ইউয়ানে নামিয়ে আনার কথা জানিয়েছে গবেষণা দল।
২০৩০ সালে কি ফিউশন থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে?
চীনের লক্ষ্য ২০৩০ সালের দিকে নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে প্রথম বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রদর্শন করা। তবে এখানে ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন’ এবং ‘বাণিজ্যিকভাবে ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু’—এই দুটি বিষয় আলাদা।
চীনের BEST প্রকল্পের লক্ষ্য ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ মূল নির্মাণকাজ শেষ করা। এরপর সেখানে burning plasma বা জ্বলন্ত প্লাজমা সম্পর্কিত পরীক্ষা চালিয়ে ২০৩০ সালের দিকে ফিউশন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রদর্শন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থাৎ ২০৩০ সালের লক্ষ্যকে এখনই ‘চীন বাণিজ্যিক ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করবে’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
বিশেষজ্ঞদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো ফিউশন বিক্রিয়া দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল রাখা, উৎপাদিত শক্তি দিয়ে পুরো ব্যবস্থার প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত শক্তি পাওয়া এবং সেই তাপকে কার্যকরভাবে বিদ্যুতে রূপান্তর করা।
আগে থেকেই এগিয়ে রয়েছে EAST
চীনের ফিউশন গবেষণার সবচেয়ে পরিচিত পরীক্ষামূলক যন্ত্রগুলোর একটি হলো EAST—Experimental Advanced Superconducting Tokamak, যাকে সাধারণভাবে ‘কৃত্রিম সূর্য’ বলা হয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে EAST ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার প্লাজমা ১,০৬৬ সেকেন্ড, অর্থাৎ প্রায় ১৭ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড ধরে স্থিতিশীল রাখার রেকর্ড করেছিল।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে চীনা গবেষকেরা EAST-এ প্লাজমার density limit অতিক্রম করার একটি পদ্ধতি শনাক্ত করার কথাও জানান। গবেষণাটি Science Advances জার্নালে প্রকাশিত হয়।
এই গবেষণাগুলো ভবিষ্যতের বড় ও শক্তিশালী ফিউশন যন্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পদার্থবিজ্ঞান ও প্রকৌশল জ্ঞান তৈরিতে সহায়তা করছে।
একটি ভাইরাল দাবিতে বড় ভুল
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু পোস্টে ৫৮২ টনের ফিউশন ম্যাগনেটের সঙ্গে চীনের একটি সমুদ্রভিত্তিক নজরদারি জাহাজের তথ্য একসঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে জাহাজটির নাম Yuan Wang-1 এবং ওজন প্রায় ৩০ হাজার টন বলা হয়েছে।
এই তথ্যটি সঠিক নয়।
Yuan Wang-1 চীনের পুরোনো satellite and missile tracking ship। এটি প্রায় ২১ হাজার টনের জাহাজ এবং ২০১১ সালে অবসর নেয়।
অন্যদিকে প্রায় ৩০ হাজার টনের নতুন চীনা সমুদ্রভিত্তিক tracking vessel-এর নাম Liaowang-1। এটি Yuan Wang-1 নয়। বিভিন্ন open-source maritime analysis অনুযায়ী, Liaowang-1 প্রায় ২২৫ মিটার দীর্ঘ এবং ৩০ হাজার টনের বেশি displacement-এর হতে পারে। জাহাজটিতে বড় রাডার ও electronic surveillance ব্যবস্থা রয়েছে এবং এর কাজ satellite, rocket ও missile tracking-এর সঙ্গে সম্পর্কিত।
অর্থাৎ ৫৮২ টনের ম্যাগনেট এবং ৩০ হাজার টনের tracking ship—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রকল্প।
বিশ্বে ফিউশন প্রতিযোগিতা
চীন একা নয়; যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অন্যান্য দেশও নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ITER প্রকল্প ফিউশন গবেষণার অন্যতম বৃহৎ সহযোগিতামূলক উদ্যোগ।
চীনের EAST, CRAFT ও BEST প্রকল্পের গবেষণাও ভবিষ্যৎ ফিউশন রিঅ্যাক্টরের জন্য প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরির অংশ। আন্তর্জাতিক গবেষণা কাঠামোয় চীনের EAST থেকে ITER এবং পরবর্তী CFETR/DEMO পর্যায়ের দিকে এগোনোর পরিকল্পনার কথাও বহু বছর ধরে আলোচিত হয়ে আসছে।
ফিউশনকে দীর্ঘমেয়াদে কম-কার্বন বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে দেখা হলেও বাণিজ্যিক পর্যায়ে প্রযুক্তিটি এখনো প্রমাণিত হয়নি। ফলে ২০৩০ সালের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলেও সেটিকে ফিউশন প্রযুক্তির চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখা যাবে না; বরং বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
৩. Timeline
- ১৯৯৮: চীনের EAST প্রকল্প অনুমোদন পায়।
- ২০২৫ সালের জানুয়ারি: EAST ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি প্লাজমা ১,০৬৬ সেকেন্ড ধরে রাখে।
- জানুয়ারি ২০২৬: EAST-এ plasma density limit অতিক্রমের নতুন পদ্ধতির গবেষণা প্রকাশিত হয়।
- ২৭ জুন ২০২৬: CRAFT-এর ৫৮২ টনের টোরয়ডাল-ফিল্ড সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেটের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়।
- ২৭ জুন ২০২৬: উচ্চ-তাপমাত্রার সুপারকন্ডাক্টিং central solenoid-ও পূর্ণ কর্মপরিসরে পরীক্ষা করা হয়।
- ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ: BEST নির্মাণ শেষ করার লক্ষ্য।
- ২০৩০ সালের দিকে: ফিউশন থেকে প্রথম বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রদর্শনের লক্ষ্য।
৪. Background
নিউক্লিয়ার ফিউশনে দুটি হালকা নিউক্লিয়াস একীভূত হয়ে অপেক্ষাকৃত ভারী নিউক্লিয়াস তৈরি করে এবং এ প্রক্রিয়ায় বিপুল শক্তি মুক্ত হয়। সূর্যেও একই মৌলিক প্রক্রিয়া ঘটে।
Tokamak প্রযুক্তিতে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে অত্যন্ত উত্তপ্ত প্লাজমাকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। EAST হলো চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ superconducting tokamak গবেষণা স্থাপনা। CRAFT-এর কাজ মূলত ভবিষ্যৎ ফিউশন রিঅ্যাক্টরের প্রয়োজনীয় প্রকৌশল ও প্রযুক্তি যাচাই করা, আর BEST আরও উন্নত burning-plasma ও fusion-energy demonstration-এর দিকে এগোচ্ছে।
৫. Impact Analysis
জ্বালানি: সফল হলে ফিউশন দীর্ঘমেয়াদে বিপুল পরিমাণ কম-কার্বন বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎস হতে পারে।
প্রযুক্তি: সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট, cryogenic systems, plasma control এবং advanced materials-এর উন্নয়ন অন্য শিল্পেও ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে।
চীনের অবস্থান: ৫৮২ টনের ম্যাগনেটের মতো বড় প্রকৌশলগত সক্ষমতা চীনের ফিউশন গবেষণায় প্রযুক্তিগত ও শিল্প সক্ষমতার বিস্তার দেখায়।
বাস্তব সীমাবদ্ধতা: এখনো বাণিজ্যিকভাবে নির্ভরযোগ্য fusion power plant চালু হয়নি। তাই ২০৩০ সালের লক্ষ্যকে নিশ্চিত সাফল্য হিসেবে নয়, প্রদর্শনের লক্ষ্য হিসেবে দেখা উচিত।
৬. Current Status
চীন ৫৮২ টনের বিশ্বের বৃহত্তম fusion-reactor superconducting magnet-এর পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। এটি ফিউশন প্রযুক্তির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশলগত অগ্রগতি। একই সঙ্গে BEST প্রকল্পের নির্মাণ এগিয়ে চলছে এবং ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ সেটি সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
চীনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের দিকে নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে প্রথম বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রদর্শন করা হতে পারে। তবে এটি বাণিজ্যিক ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর সমান নয়।
আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার: ৫৮২ টনের ফিউশন ম্যাগনেট এবং ৩০ হাজার টনের Liaowang-1 tracking ship আলাদা প্রকল্প। Yuan Wang-1-এর সঙ্গে এই তথ্য জুড়ে দেওয়া বিভ্রান্তিকর।
তথ্যসূত্র
- Chinese Academy of Sciences — China’s Artificial Sun Engineering Milestone
- Institute of Plasma Physics, CAS — Fusion Reactor Superconducting Magnets
- Xinhua — China’s Artificial Sun Engineering Milestone
- CGTN — China’s Artificial Sun Targets First Electricity by 2030
- Global Times — China Completes World’s Largest Fusion Magnet
- South China Morning Post — China’s World’s Biggest Fusion Magnet
- CCTV — China’s Controlled Nuclear Fusion Development
- International Atomic Energy Agency (IAEA) — China Fusion Research Roadmap
- IEEE Spectrum — China’s Fusion Energy Development
- CSIS — China’s Fusion Energy Infrastructure
- Forbes — China’s 582-Ton Fusion Magnet
