বাংলাদেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আগস্টে দ্রুত বাড়ছে। ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮৩৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন পাঁচজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২৮ হাজার ৯২৯ এবং মৃত্যু ৮২ জনে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগস্টে এসে আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায়, ২৩ আগস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত, দেশে নতুন করে ৮৩৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে মারা গেছেন আরও পাঁচজন। এতে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ডে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে, ২০২৬ সালের শুরু থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৮ হাজার ৯২৯ জন। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আগস্টের ধারাবাহিক সংক্রমণ এবং মৃত্যুর ঘটনা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
কী ঘটেছে
ডেঙ্গুর দৈনিক সংক্রমণে আগস্টে উল্লেখযোগ্য ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। ২৩ আগস্টের ২৪ ঘণ্টায় ৮৩৯ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া চলতি বছরের অন্যতম বড় দৈনিক সংখ্যা। একই সময়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মোট হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২৮ হাজার ৯২৯। এর মধ্যে আগস্টেই সংক্রমণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর আগে ১৮ আগস্টের ২৪ ঘণ্টায় ৭৫৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং তিনজনের মৃত্যু হয়েছিল।
১৩ আগস্টও ২৪ ঘণ্টায় ৬৯৩ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং দুজন মারা যান। তখন চলতি বছরের মৃত্যুর সংখ্যা ৬৫-এ পৌঁছেছিল।
আগস্টেই কেন বাড়ছে সংক্রমণ
বাংলাদেশে ডেঙ্গু সাধারণত বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বেশি ছড়ায়। এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য জমে থাকা পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বৃষ্টির পর বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্রসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা চলতি বছরের শুরু থেকেই ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্ষা শেষ হওয়ার পরও এক থেকে দেড় মাস ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়তে পারে এবং জুলাই-আগস্টে সংক্রমণ সাধারণত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
আগস্টের শুরুতেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছিলেন, অব্যাহত বৃষ্টি এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে এবং মাসটি ডেঙ্গুর মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পরিণত হতে পারে।
ঢাকার বাইরে সংক্রমণও বাড়ছে
ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন জেলায় রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং কিছু এলাকায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিও সেই প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ১ জানুয়ারি থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত ৪৯২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে বহির্বিভাগে আরও ৩১৬ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম; এরপর আগস্টে তা দ্রুত বেড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যভিত্তিক ড্যাশবোর্ডেও দেশের বিভিন্ন বিভাগে ডেঙ্গু রোগীর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। ফলে রাজধানীর পাশাপাশি জেলা পর্যায়েও নজরদারি ও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকারি ও স্বাস্থ্য খাতের প্রতিক্রিয়া
ডেঙ্গু মোকাবিলায় রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং মশা নিয়ন্ত্রণ—তিনটি ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত ডেঙ্গু পরিস্থিতির তথ্য প্রকাশ করছে এবং হাসপাতালভিত্তিক রোগীর সংখ্যা পর্যবেক্ষণ করছে।
সরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার জন্য ডেঙ্গুর ক্লিনিক্যাল গাইডলাইনও রয়েছে। গুরুতর রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ওপর এসব নির্দেশিকায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ডেঙ্গু একটি মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। এর উপসর্গ হালকা হতে পারে, আবার কিছু রোগীর ক্ষেত্রে গুরুতর অবস্থাও তৈরি হতে পারে। গুরুতর ডেঙ্গুতে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে।
রোগীদের জন্য সতর্কতা
জ্বরের সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা, শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমি বমি ভাব বা র্যাশ দেখা দিলে ডেঙ্গুর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীকে ঝুঁকিমুক্ত ধরে নেওয়া ঠিক নয়, কারণ গুরুতর ডেঙ্গুর সতর্কতামূলক লক্ষণ এ সময় দেখা দিতে পারে।
ডেঙ্গু সন্দেহ হলে নিজে থেকে ওষুধ খাওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে কোন ওষুধ নিরাপদ, তা চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।
টাইম লাইন
- জুন ২০২৬: ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়তে থাকার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন; বর্ষা-পরবর্তী সময়েও সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
- জুলাই ২০২৬: সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে; জুলাইয়ে ৩৬ জনের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশিত হয়।
- ৪ আগস্ট: ২৪ ঘণ্টায় ৫৩০ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন; চলতি বছরের মোট ভর্তি ১৭ হাজার ২১৪ ছাড়ায়।
- ১৩ আগস্ট: ৬৯৩ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি এবং দুজনের মৃত্যু; মোট মৃত্যু ৬৫।
- ১৮ আগস্ট: ৭৫৩ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি এবং তিনজনের মৃত্যু; মোট মৃত্যু ৭৪।
- ২৩ আগস্ট: ৮৩৯ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি এবং পাঁচজনের মৃত্যু; মোট আক্রান্ত ২৮ হাজার ৯২৯ এবং মৃত্যু ৮২।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু দীর্ঘদিনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর বিস্তৃতি ও মৌসুমি ধরনে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতম প্রাদুর্ভাবগুলোর একটি ঘটে; সরকারি হিসাবে ওই বছর তিন লাখের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং ১,৭০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তার শুধু নগর এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও জলবায়ুগত পরিবর্তনের মতো পরিবেশগত কারণ এডিস মশার বিস্তার এবং রোগের মৌসুমি ধরনে প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৫ সালেও দেশে ডেঙ্গুর বড় প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। বছর শেষে এক লাখের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি এবং ৪১৩ জনের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।
ডেঙ্গুর বর্তমান ঊর্ধ্বগতি সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করছে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর। প্রতিদিন শত শত নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় চিকিৎসক, নার্স, শয্যা এবং পরীক্ষার সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
নগর এলাকার পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে রোগীর সংখ্যা বাড়লে স্থানীয় হাসপাতালগুলোর ওপরও চাপ বাড়বে। বিশেষ করে যেসব জেলায় ডেঙ্গুর রোগী দ্রুত বাড়ছে, সেখানে পর্যাপ্ত পরীক্ষা, চিকিৎসা ও রেফারেল ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, শুধু হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি, পরিচ্ছন্নতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম একসঙ্গে চালানো প্রয়োজন।
বর্তমান অবস্থা
২৩ আগস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত পাওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট ২৮ হাজার ৯২৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ৮২ জন মারা গেছেন। একদিনে নতুন করে ৮৩৯ জন হাসপাতালে ভর্তি এবং পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
আগস্টে সংক্রমণের গতি বাড়তে থাকায় সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে বৃষ্টিপাত, এডিস মশার ঘনত্ব, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এবং দ্রুত রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার ওপর।
সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, সম্ভাব্য এডিস প্রজননস্থল নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
